|BLOG

কম্পিউটারে বাংলায় লেখাঃ শুরুর কথা

বর্ণমালা

আগুন আবিস্কারের ইতিহাস কিংবা চাকা আবিস্কারের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। অথবা অন্য যে কোন বড় আবিস্কারের পেছনের ইতিহাসটা ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই সাধারণত মানুষের চাহিদা নতুন কিছু আবিস্কারের পেছনে অনুঘটকের মতো কাজ করে। চাহিদাতো অনেক মানুষেরই থাকে, তাই বলে কি সবাই কিছু না কিছু আবিস্কার করে ফেলে? করে না। কারণ চাহিদার চেয়েও যে জিনিসটি বড় তা হলো একটি অনুসন্ধিৎসু মন। নতুন কিছু করার নেশা। এই নেশার কারণেই এডিসন তৈরী করেছিলেন বৈদ্যুতিক বাতি, বিল গেটস জন্ম দিয়েছেন মাইক্রোসফটের, স্টিভ জবস অ্যাপলের।

এই অনুসন্ধিৎসু মনের সাথে যদি প্রেরণা বা কোন কিছুর প্রতি তীব্র ভালোবাসা কাজ করে, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হতে পারে? আজ তিন জন মানুষের গল্প বলবো যারা মায়ের ভাষার প্রতি তীব্র ভালোবাসা থেকে জন্ম দিয়েছেন এক ইতিহাসের। সাইফ শহীদ, মোস্তফা জব্বার এবং মেহেদি হাসান। আমরা যে খুব আদর করে কম্পিউটারের কি-বোর্ড টিপে টিপে বাংলা ভাষায় ছড়া লিখছি, গল্প লিখছি অথবা আমাদের কোন অনুভূতিকে প্রকাশ করছি, এ সবই সম্ভব হয়েছে এই তিনজন মানুষের জন্য। ভাষা সৈনিকেরা মায়ের জন্য তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ করেছেন। রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে বিশ্ব দরবারে আমাদের ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। আর বর্তমানের এই বর্ণ সৈনিকেরা ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে স্থান করে দিয়েছেন।

বাংলা কি-বোর্ডর ধারণাটা প্রথম প্রয়োগ করেন শহীদ মুনীর চৌধুরী ১৯৬৫ সালে, তার ‘মুনীর’ কি-বোর্ডর মাধ্যমে। এটি ছিলো টাইপ রাইটারের জন্য তৈরী করা একটি QWERTY কি-বোর্ড লেআউট। এটিই বাংলা ভাষায় প্রথম লেআউট।

কিন্তু কম্পিউটারের জন্য তো শুধুমাত্র একটি লেআউট হলেই হবে না। সাথে প্রয়োজন সফটওয়্যার বা মূল প্রোগ্রামিং যা এই লেআউটকে কম্পিউটারের বোধগম্য ভাষায় রুপান্তর করবে এবং ‘ফন্ট’ যা লেখাটাকে কম্পিউটারের মনিটরে দেখাবে।

সাইফ শহীদ পেশায় একজন যন্ত্র প্রকৌশলী। কর্মজীবন শুরু করেন বেক্সিমকোতে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রাইভেট কোম্পানী হিসেবে বেক্সিমকো খুব দ্রুত প্রসার লাভ করতে লাগলো। তাদের কাজে গতি আনার জন্য তারা আমেরিকা থেকে একটি কম্পিউটার কিনে আনলো। কম্পিউটারের যন্ত্রপাতির সাথে বিশাল সাইজের দুটি ম্যানুয়াল। তো ম্যানুয়াল পড়ে পড়ে এই যন্ত্রপাতিগুলো জোড়া লাগানোর দায়িত্ব পড়লো সাইফ শহীদের উপর। অনেক ঘেটে-ঘুঁটে তিনি কম্পিউটার সেট করলেন। কিন্তু সেটা আর চলে না। ঘটনা কি? সাইফ শহীদ ম্যানুয়াল দুটো বাসায় নিয়ে সারা রাত পড়লেন। পর দিন আবার চালু দিয়ে ঘোষনা করলেন এই কম্পিউটারের মাদারবোর্ড নষ্ট। আমেরিকাতে ফোন করে সেই কম্পিউটার কোম্পানীর ইঞ্জিনিয়ারকে বললেন তোমাদের মেশিনের মাদারবোর্ড নষ্ট, নতুন একটা এনে ঠিক করে দিয়ে যাও। ইঞ্জিনিয়ারতো তাকে পাত্তাই দিলো না। পরে দেখা গেলো আসলেই মাদারবোর্ডটা নষ্ট ছিলো।

তো, এই কম্পিউটার নিয়ে কাজ করতে করতেই তার মাথায় কম্পিউটারে বাংলা লেখার ধারণাটা এলো। সে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। যদিও ‘মুনীর’ কি-বোর্ড ছিলো প্রথম বাংলা লেআউট কিন্তু এটা যথেষ্ট জটিল ছিলো। সাইফ শহীদ QWERTY এর সাথে মিল রেখে সম্পূর্ণ নতুন একটি লেআউট তৈরী করলেন। এটির নাম দিলেন ‘শহীদ লিপি’। সাইফ শহীদের নামের সাথে ‘শহীদ লিপি’ নামটি কাকতালীয়ভাবে মিলে গেলেও, এই নাম করণের পেছনের ইতিহাসটা তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে, “১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯- এ চার বছর যখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র- তখন প্রতিটি শহীদ দিবসে শহীদ মিনারে যেতাম প্রভাব ফেরীতে যোগ দিতে। শেষের বছরগুলিতে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হবার কারনে আরও ব্যস্তায় কাটতো ঐ দিনটি। ফলে ১৯৮৫ সালে যখন লন্ডন থেকে কমিউপউটারে প্রথম বাংলায় চিঠি লিখে পাঠালাম ঢাকাতে আমার মাকে, তখন একটা নামই শুধু মনে এসছিল- তাই এ প্রচেষ্টার নামকরণ করলাম, “শহীদলিপি”।

১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫, এ দুই বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে সাইফ শহীদ এবং তার সহকর্মীরা তৈরী করেছেন এই লেআউট। সেই সাথে তারা এর জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার এবং কিছু ট্রু-টাইপ ফ্রন্ট যেমন, যশোর, ঢাকা, ফরিদপুর, ভোলা, লালমনিরহাট, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, চিটাগং, সিলেট তৈরী করেছিলেন। ‘শহীদলিপি’র প্রথম ভার্সনটি করা হয়েছিলো গ্রাফিক্স নির্ভর অ্যাপলের ম্যাকিনটশ কম্পিউটারের জন্য। পরবর্তীতে উইন্ডোজের জন্য একটি ভার্সন তারা বাজারজাত করেন।

মজার বিষয় হলো, তিনি যখন এই ‘শহীদলিপি’ তৈরী করেন, তখনকার দিনে কম্পিউটার এর দাম সাধ্যের বাহিরে হবার কারণে বেশিরভাগ মানুষই তা কিনতে পারতো না। তাই এই প্রচেষ্টার কোন ব্যবসায়িক মূল্য ছিলো না। একারণে তেমন কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজে থেকেই কাজ শুরু করেন তিনি। যদিও বছর খানেকের মধ্যেই বেশিরভাগ সরকারী এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে তার এই লেআউটই কম্পিউটারে একমাত্র বাংলা লেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হতে লাগলো। আজ ২৫ জানুয়ারী, ‘শহীদলিপি’র জন্মদিন। একই সাথে জন্মদিন এই সফটওয়্যারের রূপকার প্রকৌশলি সাইফ শহীদের। এই বর্ণ সৈনিকের প্রতি রইলো আমাদের অশেষ ভালোবাসা।

একজন সাংবাদিক হিসেবে মোস্তফা জব্বার প্রিন্টিং জগতের সাথে জড়িত দীর্ঘদিন থেকেই। নতুন ধরণের প্রিন্টিং যন্ত্রপাতি কেনার জন্য লন্ডনে যাবার পর, সেখানে তিনি দেখেন তারা পার্সোনাল কম্পিউটার ও প্রিন্টার ব্যবহার করে প্রিন্ট করছে। সাথে সাথেই তার মাথায় আইডিয়াটা খেলে যায়। তার কাছে মনে হলো বাংলাতে লেখার প্রিন্টের জন্য তিনি একটি নতুন গল্প তৈরী করতে পারবেন। দেশে আসার সময় সাথে করে পার্সোনাল কম্পিউটার এবং একটি প্রিন্টার নিয়ে এলেন। সেই সময় কেবল দু’ধরণের বাংলা লেআউটের প্রচলন ছিলো। একটি ‘মুনীর’ কি-বোর্ড এবং আরেকটি ‘শহীদলিপি’। কিন্তু এগুলোর কোনটাই পার্সোনাল কম্পিউটারে ব্যবহারের জন্য উপযোগী ছিলো না। এরপর শুরু হলো মোস্তফা জব্বারের দেড় বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম। তিনি নিজের হাতেই লেআউটের প্ল্যান এবং ফন্টের ডিজাইন করেছেন। আর সফটওয়্যারের ডিজাইন করেছেন দেবেন্দ্র যোশী নামক এক ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার। তিনি BKBD নামের ৩ কিলোবাইটের এক সফটওয়্যারের প্রোগাম লিখেন। এরপরের সবটুকুইতো আমরা জানি। ১৯৮৮ সালে মোস্তফা জব্বার অ্যাপলের ম্যাকিনটশ কম্পিউটারের জন্য রিলিজ করেন তার ‘বিজয়’ কি-বোর্ড এর প্রথম ভার্সন। বাঙালির স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বের বিজয়ের সাথে মিলিয়ে দেশের সবচেয়ে ব্যবসা সফল বাংলা লেআউটের এই নামকরণ করেন তিনি।

‘বিজয়’ এর প্রথম ভার্সন করা হলো মূলত Mac SE, Mac+512 KE এবং Mac-2 কম্পিউটারের জন্য। পরবর্তীতে উইন্ডোজের জন্য বিভিন্ন ভার্সন রিলিজ করেন তিনি। ধীরে ধীরে পার্সোনাল কম্পিউটারে বাংলা লেখার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় কি-বোর্ডে পরিণত হয় ‘বিজয়’। প্রায় ৯৯ শতাংশ বাংলা লেখাই এই লেআউট ব্যবহার করে লেখা হতো। মোস্তফা জব্বারের এই অবদানের ফলে কম্পিউটারে বাংলা লেখা সাধারণ মানুষের কাছে খুব সহজ হয়ে গেলো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তার এই অবদানের ফলে প্রিন্টিং জগতে বাংলা ছাপার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। প্রিন্টিং প্রেসগুলো দীর্ঘদিনের প্রচলিত যন্ত্রপাতির বদলে বাংলা ছাপার জন্য কম্পিউটার ব্যবহার শুরু করলো। খুব সহজ কথায়, ভাষার ব্যবহারে সম্পূর্ণ নতুন বিপ্লবের জন্ম দিলেন মোস্তফা জব্বার।

TEDxDhakatalk এ মেহেদি হাসান খান এর একটি কথা ছিলো এমন, “আমি এখন আর অসাধারণ মানুষে বিশ্বাস করি না। বরং আমি সে সব সাধারণ মানুষে বিশ্বাস করি যারা বেপরোয়া হয়ে অসাধারণ সব কাজ করছেন”। মেহেদি হাসানের ‘ওমিক্রন ল্যাব’ যখন ২০০৩ এ ‘অভ্র’ রিলিজ করে, তখন তার বয়স ১৯ বছর। মেডিক্যাল সায়েন্স ব্যকগ্রাউন্ডের এই তরুণ তার ‘অভ্র’র জন্য বেছে নেন, ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত’ স্লোগানটি। মেহেদি হাসান খান সত্যিকার অর্থেই ডিজিটাল দুনিয়ায় বাংলা ভাষাকে মুক্ত করে দিয়েছেন। তারা অভ্রকে বলেন Freeware (i.e: free-of-charge software application).

এই প্রজেক্টের আইডিয়া তার মাথায় আসে ২০০৩ এ। তখন একুশে বইমেলায় বাংলা ইনোভেশন থ্রু ওপেন সোর্স, বায়োস নামে একটা সংগঠন বাংলা নামে একটা প্রদর্শনী করে। এখানে পুরো ইন্টারফেসটা ছিলো বাংলায় এবং বাংলায় লেখালেখিও করা যেতো। মেহেদি হাসান তাদের বাংলা ফন্টটা ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করেন বাংলায় লেখালেখির জন্য। কিন্তু দেখা গেলো এই ফন্ট ব্যবহার করে লেখার জন্য উইন্ডোজে কোন কি-বোর্ড নেই। অনেক ঝামেলা করে মাইক্রোসফট ওয়ার্ডের ইনসার্ট ক্যারেক্টার থেকে ওই ফন্টের ক্যারেক্টারগুলো ব্যবহার করে বাংলা লেখা সম্ভব। কিন্তু সরাসরি ওই ফন্টের জন্য কোন কি-বোর্ড ছিলো না। মানে হলো, ওই ফন্টের জন্য একটা কি-বোর্ড থাকলে উইন্ডোজ ইউনিকোডে বাংলা লেখা সম্ভব ছিলো। ব্যস, তখন থেকেই তিনি কাজে নেমে পড়েন। ডেভলপার হিসেবে কাজ করেছেন রিফাত-উন-নবী। আর ফন্ট ডেভলপার হিসেবে কাজ করেছেন সিয়াম। সিয়াম-রুপালী ফন্টটা তারই বানানো।

‘অভ্র’র সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিচার হচ্ছে ফোনেটিক কি-বোর্ড। অবশ্য এপ্লিকেশন ডেভলপার হাসিন হায়দারও ফোনেটিক কি-বোর্ডের একটি প্রোগ্রাম তৈরী করেছিলেন। এর সাহায্যে রোমান ক্যারেক্টারে কোন কিছু লেখা হলে সেটি বাংলা শব্দে রুপান্তরিত হয়ে যায়। এর ফলে বাংলা লেখা হয়ে গেলো অনেক সহজ। কেউ বাংলায় কিছু লিখতে চাইলে তাকে পুরো বাংলা কি-বোর্ডটা আর মুখস্ত করতে হচ্ছে না। ইংরেজি কি-বোর্ড ব্যবহার করেই বাংলা লেখা সম্ভব হচ্ছে। ‘অভ্র’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ইন্টারনেটে বাংলা লেখার জন্য এই কি-বোর্ডের ব্যবহার। অর্থাৎ বাংলা ভাষা এখন পার্সোনাল কম্পিউটারের গন্ডি ছাড়িয়ে স্থান করে নিলো ইন্টারনেটের ভাচুর্য়াল পাতায়। আর এই কি-বোর্ড হলো সবার জন্য উন্মুক্ত। এই বর্ণ সৈনিকের ‘অভ্র’ বর্তমানে বাংলা লেখার অন্যতম জনপ্রিয় লেআউট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কম্পিউটারে বাংলা লেখার জন্য অনেকগুলো কি-বোর্ড বর্তমানে প্রচলিত। অনেকেই অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তাদের প্রচেষ্টাগুলোকে সফল করা জন্য। কেন করেছেন? শুধুই ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে? উহু। নতুন কিছু করার নেশা, অনুসন্ধিৎসা আর সবচেয়ে বড় বিষয় মায়ের ভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকেই তারা উদ্ভাবনগুলো করেছেন। ইতিহাসতো নদীর পানির মতো গড়িয়ে চলে। পেছনে রেখে যায় ঢেউয়ের চিহ্ন। তেমনি করে বাংলা ভাষার ইতিহাসে এই বর্ণ সৈনিকদের অবদান আমাদের অনুপ্রাণিত করবে যুগ যুগ ধরে।

(ছবি কার্টেসীঃ মুগ্ধ অভিযাত্রিকের ব্লগ থেকে নেয়া)

Share this story

Leave a Comment